
সারা দেশে বসছে ১০ লাখ এআই ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হবে অপরাধ ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন
অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সারা দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। পরিকল্পনার আওতায় দেশের ৬৪ জেলা, সব মহানগর এবং গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ককে নজরদারির আওতায় আনা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ জন্য প্রায় ১০ লাখ এআই ক্যামেরা কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আগামী দুই বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রচলিত সিসি ক্যামেরার মতো শুধু দৃশ্য ধারণ নয়, এআই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করতে পারবে। অপরাধী শনাক্ত, গাড়ির নম্বর প্লেট পড়া, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এবং সন্দেহজনক গতিবিধি রিয়েল টাইমে শনাক্ত করার সক্ষমতা থাকবে এসব ক্যামেরায়।
জনবহুল এলাকায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের মুখ স্ক্যান করে ডেটাবেজে থাকা সাজাপ্রাপ্ত আসামি, পরোয়ানাভুক্ত অপরাধী কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিকে শনাক্ত করা যাবে। কোনো অপরাধী গাড়িতে পালিয়ে গেলে নম্বর প্লেট শনাক্ত করে পরবর্তী এলাকায় তার গতিবিধিও অনুসরণ করা সম্ভব হবে।
রাজধানীতে ইতোমধ্যে ৩৭ ক্যামেরা
দেশজুড়ে এআই ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, রাজধানীর ১৬টি পয়েন্টে বর্তমানে ৩৭টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে আইন ভাঙার প্রবণতা কমেছে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে রাজধানীর দুই শতাধিক পয়েন্টে ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। গাড়ি চুরি প্রতিরোধ ও অপরাধী শনাক্ত করতেও এসব ক্যামেরার সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে ই-মামলা
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতেও এআই ক্যামেরার ব্যাপক ব্যবহার করা হবে। সিগন্যাল অমান্য, উল্টোপথে গাড়ি চালানো, হেলমেট না পরা, নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম এবং ট্রাফিক লাইন অতিক্রমের মতো অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হবে।
আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত হলে সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ই-মামলা তৈরি করা হবে। সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের মোবাইল ফোনে পাঠানো হবে মামলার তথ্য। এ জন্য সফটওয়্যারের সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্ভার যুক্ত করা হয়েছে।
এআই ক্যামেরা সন্দেহজনক জটলা, মারামারি, আগুন কিংবা পরিত্যক্ত বস্তু শনাক্ত করেও নিয়ন্ত্রণকক্ষে সংকেত পাঠাতে পারবে।
নিখোঁজ শিশু ও অপহৃত ব্যক্তিকে শনাক্তের পরিকল্পনা
ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপহৃত ব্যক্তি ও নিখোঁজ শিশুদের শনাক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর ডেটাবেজের সঙ্গেও ক্যামেরা নেটওয়ার্ক যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে ৯৯৯-এ কোনো অভিযোগ আসার পর ঘটনাস্থলের কাছাকাছি স্থাপিত ক্যামেরার লাইভ দৃশ্য নিয়ন্ত্রণকক্ষে দেখা সম্ভব হবে। এতে দ্রুত ঘটনাস্থল শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
মহাসড়কেও বাড়বে নজরদারি
দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোও এআই ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে ঢাকা-মাওয়া সড়কে ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পর্যায়ক্রমে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-বগুড়া, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-খুলনাসহ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হবে।
এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই প্রযুক্তিনির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। ওভারস্পিড, অবৈধ পার্কিং ও উল্টোপথে গাড়ি চালানোসহ বিভিন্ন ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা করা হবে। মামলার তথ্য এসএমএসের মাধ্যমে গাড়ির মালিককে জানানো হবে।
পুলিশের আশা, এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু হলে সড়কে শৃঙ্খলা বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও অপরাধ কমানো সম্ভব হবে।
তথ্য সুরক্ষায় গুরুত্ব
এআই ক্যামেরার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ হওয়ায় নাগরিকদের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুলিশ। ক্যামেরা নেটওয়ার্কের তথ্য নিরাপদ রাখতে ফায়ারওয়াল ও এনক্রিপশন ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের এআই প্রযুক্তি পরিচালনা ও তথ্য বিশ্লেষণের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। ক্যামেরা কেনা ও কারিগরি সহায়তার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের।












Design and Development by : webnewsdesign.com