সম্পূর্ণ নিউজ Sunnah TV Bangladesh সুন্নাহ টিভি বাংলাদেশ

প্রচ্ছদ / কুরআন ও হাদিস
৮:২৫ পিএম, ৩১ আগস্ট ২০২৬

কোরআনের প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা

কোরআনের প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা

কোরআনের প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা

নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

কোরআনের সঙ্গে সাহাবিদের সম্পর্ক কেমন ছিল? যে ভালোবাসা আজও মুসলিমদের অনুপ্রেরণা

পবিত্র কোরআনের সঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের সম্পর্ক শুধু তেলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কোরআন ছিল তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নবীজি (সা.)-এর কাছ থেকে কোরআনের কোনো আয়াত নাজিল হওয়ার পর তারা তা গভীর মনোযোগে গ্রহণ করতেন এবং জীবনে বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন।

সাহাবিদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোরআনের প্রতি তাদের ভালোবাসা ছিল হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। কোরআনের প্রতিটি আয়াত তাদের হৃদয়কে নাড়া দিত, আমলকে প্রভাবিত করত এবং জীবন পরিচালনার পথ দেখাত। তাদের এই কোরআনপ্রেম আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও কোরআন আঁকড়ে ছিলেন উসমান (রা.)

কোরআনের সঙ্গে সাহাবিদের গভীর সম্পর্কের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)। নিজের খেলাফতকালে মুসলিম বিশ্বের জন্য কোরআনের মুসহাফ একীভূত ও সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনি তদারকি করেন।

জীবনের শেষ মুহূর্তেও কোরআন থেকে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়নি। শাহাদাতের আগে যখন বিদ্রোহীরা তার মদিনার বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল, তখন তিনি রোজা অবস্থায় কোরআন কোলে নিয়ে বসেছিলেন। বিদ্রোহীরা প্রাচীর টপকে ঘরে প্রবেশ করার সময়ও তিনি কোরআন তেলাওয়াতে মগ্ন ছিলেন। এমনকি শাহাদাতের মুহূর্ত পর্যন্ত তার তেলাওয়াত থামেনি।

কোরআন তেলাওয়াতের প্রতি সাহাবিদের আগ্রহ

হাদিসে কুদসিতে এসেছে, কোনো বান্দা কোরআন তেলাওয়াতে ব্যস্ত থাকার কারণে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন চাইতে না পারলে, আল্লাহ তাকে প্রার্থনাকারীদের চেয়েও বেশি দান করেন।

সাহাবায়ে কেরাম এসব শিক্ষা সরাসরি নবীজি (সা.)-এর কাছ থেকে পেয়েছিলেন। ফলে কোরআন তেলাওয়াত তাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।

তবে তারা শুধু বেশি বেশি পড়ার দিকে নজর দেননি; বরং কোরআন বুঝে পড়ার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। নবীজি (সা.) সতর্ক করেছেন, তিন দিনের কম সময়ে কোরআন খতম করলে তা যথাযথভাবে বোঝা কঠিন হয়ে যায় এবং তেলাওয়াতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৩৯৪)

এ কারণে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার অনুসারীদের সাত দিনে এক খতম করার পরামর্শ দিতেন। সাহাবিদের কাছে কোরআন খতমের সংখ্যা নয়, বরং তেলাওয়াতের গভীরতা ও অর্থ অনুধাবন ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সাত দিনে কোরআন খতমের পদ্ধতি

সাহাবায়ে কেরাম পুরো কোরআনকে সাতটি মঞ্জিলে ভাগ করে তেলাওয়াত করতেন। প্রথম দিনে সুরা ফাতিহা থেকে সুরা নিসা, দ্বিতীয় দিনে মায়েদা থেকে তওবা—এভাবে সপ্তম দিনে কাফ থেকে নাস পর্যন্ত তেলাওয়াত সম্পন্ন করা হতো। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৩৯৩)

ঘরে ঢুকেই মুসহাফ খুলতেন ওমর (রা.)

হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর কোরআনপ্রেমের কথাও সাহাবিদের বর্ণনায় পাওয়া যায়। ইবনে আব্বাস (রা.)-এর পর্যবেক্ষণ ছিল, ওমর (রা.) যখনই ঘরে প্রবেশ করতেন, তার প্রথম কাজগুলোর একটি ছিল মুসহাফ খুলে বসা।

হজরত আবু বকর (রা.)-ও ছিলেন কোরআন তেলাওয়াতে অত্যন্ত আগ্রহী। তিনি তাহাজ্জুদের নামাজে দীর্ঘ তেলাওয়াত করতেন এবং সুযোগ পেলেই কোরআন পড়তেন। ইফকের ঘটনায়ও বর্ণিত হয়েছে, হজরত আয়েশা (রা.) যখন উটে চড়ে ঘরে ফিরছিলেন, তখন আবু বকর (রা.) বৈঠকখানায় বসে কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ)

হজরত আয়েশা (রা.) নিজেও প্রতিদিন নিজের বিছানায় বসে এক মঞ্জিল কোরআন তেলাওয়াত করতেন।

ইবনে মাসউদের তেলাওয়াত শুনে কেঁদেছিলেন নবীজি (সা.)

একদিন নবীজি (সা.) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে বললেন, ‘আমাকে কোরআন পড়ে শোনাও।’

ইবনে মাসউদ (রা.) বিস্মিত হয়ে বললেন, আপনার ওপরই তো কোরআন নাজিল হয়েছে, আমি আপনাকে কীভাবে পড়ে শোনাব?

নবীজি (সা.) বললেন, ‘আমি অন্যের মুখে কোরআন শুনতে ভালোবাসি।’

এরপর ইবনে মাসউদ (রা.) সুরা নিসা তেলাওয়াত শুরু করেন। তিনি যখন ৪১ নম্বর আয়াতে পৌঁছান—যেখানে কেয়ামতের দিন প্রত্যেক উম্মতের বিরুদ্ধে সাক্ষী আনার কথা বলা হয়েছে—তখন নবীজি (সা.)-এর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘যথেষ্ট, থামো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৫০)

নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, কেউ যদি কোরআন তেমন সুন্দরভাবে পড়তে চান, যেমনভাবে তা নাজিল হয়েছে, তাহলে ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মতো করে পড়া উচিত।

অন্য এক হাদিসে নবীজি (সা.) চারজন সাহাবির কাছ থেকে কোরআন শেখার কথা বলেছেন। তারা হলেন—আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), সালিম (রা.), মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) এবং উবাই ইবনে কাব (রা.)। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৭৫৮)

হজরত ওমর (রা.) নিজেও স্বীকার করেছেন, তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে উবাই ইবনে কাব (রা.) ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম সেরা। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪১২৯)

বেশি ইবাদত করতেন, তবু ভারসাম্যের শিক্ষা পেয়েছিলেন

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)-এর ঘটনাটিও এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত শিক্ষণীয়। তিনি ইবাদতে এতটাই মনোযোগী ছিলেন যে সংসারের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারতেন না। নবীজি (সা.) তার আমল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দিনে রোজা রাখেন এবং রাতে এক খতম কোরআন পড়েন।

নবীজি (সা.) তাকে আমল কিছুটা কমানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি আরও বেশি করার সামর্থ্যের কথা জানান। শেষ পর্যন্ত নবীজি (সা.) তাকে সাত দিনে এক খতম করার নির্দেশ দেন এবং এর চেয়ে কম সময়ে খতম করতে নিষেধ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৫২)

হজরত কায়েস ইবনে আবি সাসাআ (রা.)-এর ঘটনাতেও একই ধরনের শিক্ষা পাওয়া যায়। তিনি নবীজি (সা.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কত দিনে কোরআন খতম করবেন। নবীজি (সা.) প্রথমে তাকে ১৫ দিনে খতম করার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি আরও বেশি পড়ার সামর্থ্যের কথা জানালে শেষ পর্যন্ত সাত দিনে খতমের অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তী জীবনে বয়সের কারণে যখন সাত দিনে খতম করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন তিনি ১৫ দিনে খতম করতেন এবং আফসোস করে বলতেন, নবীজি (সা.)-এর প্রথম পরামর্শটি মেনে নিলেই ভালো হতো। (মুজামুল কাবির, ১৮/৩৪৪-৪৫)

কোরআন ছিল সাহাবিদের জীবনের অংশ

সাহাবিদের জীবনে যুদ্ধ ছিল, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ছিল, পরিবার ছিল, জীবিকা ছিল—ছিল অসংখ্য ব্যস্ততা। কিন্তু এসবের মাঝেও কোরআনের জন্য সময় বের করা তাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ ছিল।

তাদের কাছে কোরআন ছিল শুধু পড়ার একটি কিতাব নয়; বরং ছিল জীবন পরিচালনার পথনির্দেশ। কোরআনের আয়াত তারা পড়েছেন, বুঝেছেন এবং নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন।

সাহাবায়ে কেরামের কোরআনপ্রেমের সেই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আজও মুসলিম উম্মাহকে কোরআনের দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানায়।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে পবিত্র কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার, নিয়মিত তেলাওয়াত করার, কোরআনের অর্থ বোঝার এবং জীবনে তার শিক্ষা বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমিন।

Facebook Comments Box
এ বিভাগের আরও খবর


আরও Sunnah TV Bangladesh সুন্নাহ টিভি বাংলাদেশ সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com

শিরোনাম