সম্পূর্ণ নিউজ Sunnah TV Bangladesh সুন্নাহ টিভি বাংলাদেশ

প্রচ্ছদ / জাতীয়
৬:০১ পিএম, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইউনূস সরকারের সব উপদেষ্টার দুর্নীতির তদন্ত এখন জনতার দাবি

ইউনূস সরকারের সব উপদেষ্টার দুর্নীতির তদন্ত এখন জনতার দাবি

শুধু যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় নয়, স্থানীয় সরকার, পদায়ন ও টেন্ডার নিয়েও অভিযোগ; তদন্তের আওতায় আসতে পারেন অন্য উপদেষ্টারাও

নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

অবশেষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রভাবশালী ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম এ তথ্য জানান।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা থাকাকালে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩৮ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন পদায়নের আদেশ দেওয়ার বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ১৫০ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য দেড় কোটি টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য আরও ২ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক দুর্নীতি তদন্ত। তবে তার বিরুদ্ধে এর বাইরেও আরও বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে দুদকে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।

আরও যেসব অভিযোগ রয়েছে

দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১টি দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার, সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম।

উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশনের অভিযোগ:
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, কথিত প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলম এসব লেনদেন তদারক করতেন।

ঢাকা ওয়াসার এমডি নিয়োগে ঘুষের অভিযোগ:
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ নিয়েও আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আব্দুস সালামকে এমডি পদে নিয়োগ দিতে ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ের একটি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে এবং বাকি ২ কোটি টাকা নগদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে নিয়োগের অভিযোগ:
২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ এজাজকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগের ক্ষেত্রেও আসিফ মাহমুদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে ২০ কোটি টাকা নগদ এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কাজে নিয়মিত কমিশনের কথা বলা হয়েছে।

পরবর্তীতে এজাজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ডিএনসিসির পশুর হাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, বাজারের দোকান বরাদ্দ, পার্কিং, ভ্যান সার্ভিস ও ফুটপাতের দোকানসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে।

টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ:
দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তি হয়। এসব টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। লেনদেন চূড়ান্ত হওয়ার পর কার্যাদেশ দেওয়া হতো বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগ:
সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়েও আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সারাদেশে জেলা প্রশাসক নিয়োগের সময় তিনি ৪৮টি ডিও লেটার দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩৬ জনকে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

জেলা ভেদে ডিসি পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে। শুধু ডিসি নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ, প্রকল্প ও সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বিদেশে সম্পদের অভিযোগ

আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব প্রকাশের পর তার সম্পদের উৎস নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, তার অর্থের একটি অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। দুবাই ও সুইজারল্যান্ডেও সম্পদ ও বিনিয়োগ থাকার অভিযোগ উঠেছে।

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির তথ্য সামনে এনে কিছু অভিযোগে আসিফ মাহমুদের সঙ্গে এর যোগসূত্রের দাবি করা হয়েছে। তবে এসব দাবির সত্যতা এখনো প্রমাণিত নয়। ফলে সংশ্লিষ্ট অর্থের উৎস ও মালিকানা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

শুধু আসিফ মাহমুদ নয়, অন্য উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

আসিফ মাহমুদের পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরও কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ:
সাব-রেজিস্ট্রার বদলি, বিচারক বদলি, জেলা প্রশাসক নিয়োগ এবং রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৮ মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিচারকদের ব্যাপক বদলি এবং বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগ নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ প্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থ লেনদেন হয়েছে।

রিজওয়ানা হাসানসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তাদের সম্পদ বৃদ্ধি, তদবির এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

এ ছাড়া মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরজাহান বেগম ও আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ইউনূসের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা থাকার সময় গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন, কর-সুবিধা ও অন্যান্য সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন, জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স এবং ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতির বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিদেশে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব অর্থের উৎস ও স্থানান্তর প্রক্রিয়া আইনসম্মত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

তবে ড. ইউনূস বা তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এখানে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেন ও আইনি প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।

তদন্তই দিতে পারে প্রকৃত উত্তর

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের আনুষ্ঠানিক তদন্তকে দুর্নীতির অভিযোগ যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শুধু একজনের বিরুদ্ধে তদন্ত নয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম বা অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়মুক্তি দেওয়াই হবে স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া।

এখন সবার নজর দুদকের তদন্তের দিকে। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কতটা সত্য, আর কতটা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত অভিযোগ—তদন্তেই তার প্রকৃত উত্তর পাওয়া যাবে।

অদিতি করিম : লেখক ও নাট্যকার

সূত্র: কালের কণ্ঠ

Facebook Comments Box
এ বিভাগের আরও খবর


আরও Sunnah TV Bangladesh সুন্নাহ টিভি বাংলাদেশ সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com

শিরোনাম